বিটকয়েন কি ? বিটকয়েনের ইতিহাস। বিটকয়েন দিয়ে কিভাবে আয় করবেন ?

বিটকয়েন হলো পিয়ার টু পিয়ার ইলেক্ট্রনিক্সস মানি  ট্রান্সফার সিস্টেম যার মাধ্যমে কোনো তৃতীয় ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের  হস্তক্ষেপ ছাড়া  অর্থ লেনদেন করা যাবে। অর্থাৎ বিটকয়েন কোনো সরকার দ্বারা পরিচালিত নয় , বিটকয়েন পরিচালিত হয় সকল সাধারণ মানুষের দ্বারা।  যেকোনো দেশে বিটকয়েন ব্যাবহার করা যায় convert এর ঝামেলা ছাড়া। আপনি যদি ইউরোপ থেকে আমেরিকার কোনো একটি দেশে শিফট করেন তাহলে আপনাকে ইউরোপের স্থানীয় মুদ্রা কে আমেরিকার dollar এ পরিনত করতে হবে। কিন্তু bitcoin এর ক্ষেত্রে এরূপ ঝামেলা পোহাতে হয় না। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনি Bitcoin দ্বারা বিনিময় করতে পারবেন। 

বিটকয়েন সর্বপ্রথম launch হয় 2008 সালে । সাতোশি নাকামোটো নামে কোনো একজন বা একাধিক ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কেউ এটি আবিষ্কার করেন । আসলে সাতোশি নাকামোটো নামের ব্যাক্তিটি কে সেটা এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি । বিটকয়েন যখন প্রথম launch হয় তখন বিটকয়েনের মূল্য ছিল ০.০০০৮ ডলার । সেই বিটকয়েন কিভাবে আজকে ৪০০০০ ডলার এ পোঁছালো সেই ইতিহাস নিয়ে আজকে আলোচনা করবো।  

ডলারের ইতিহাস 

বিটকয়েনের ইতিহাস বলতে গেলে সর্বপ্রথম ডলার বা মানির ইতিহাস জানা থাকা দরকার । প্রায় ৯০০০  থেকে ৬০০০ খ্রীষ্ঠপূর্বে মানুষ বিনিময় করার জন্য গবাদি পশু এবং চাল , ডাল ইত্যাদি বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করতো।  কিন্তু এটা খুব জটিল প্রসেস ছিল তাই পরবর্তীতে ১৩০০ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মানুষ মূল্যবান ধাতু স্বর্ণ , রুপো , কড়ি দিয়ে বিনিময় করতো । আজকের যুগে আমরা কাগজ দিয়ে বিনিময় করে থাকি । কিভাবে গবাদি পশু , মূল্যবান ধাতু কিংবা বিভিন্ন পন্য থেকে কাগজ বিনিময়ের মাধ্যম হলো? এর পেছনে কাজ করছে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। আপনি কি এখনো কনফিউজ? চলুন ক্লিয়ার করা যাক । 

বিটকয়েন কি বিটকয়েন দিয়ে আয়

প্রথমে বিভিন্ন পন্য ছিল বিনিময়ের মাধ্যম। কিন্তু দূর দূরান্তে বিনিময়ের জন্য পন্য পরিবহন করা হয়ে পড়ে কঠিন। যেমন ধরুন যদি কেউ এক মণ চাল দিয়ে এক মণ ডাল বিনিময় করলে তার জন্য এটা দূরে কোথাও পরিবহন করা কষ্টকর । এজন্যে পরবর্তীতে পণ্যের পরিবর্তে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন স্বর্ণ মুদ্রা , রৌপ্য মুদ্রা ইত্যাদি বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এজন্য সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয় এসকল ধাতব পদার্থের একটা value আছে। তারপর দেখা গেল এসকল মুদ্রা পরিবহন সাধারণ মানুষের কাছে কঠিন মনে হতে লাগলো যেহেতু দূর দূরান্তে থলেতে করে পরিবহনে এসকল মুদ্রা বা কড়ির ওজন বেশি হয়ে থাকে । সুতরাং এর বিকল্প পদ্ধতির প্রয়োজন দেখা দেয়। তারপরেই আসে কাগজের মুদ্রার ধারনা । 

সাধারণ মানুষের মধ্যে গড়ে উঠা বিশ্বাসের ধারনাটি কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে কাগজের মুদ্রা । ৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে চিনে সর্বপ্রথম কাগজের মুদ্রার প্রচলন করা হয় ।  যেহেতু গবাদি পশু বা ভারী ধাতব বস্তু পরিবহন করা কষ্টকর তাই গভার্মেন্ট(ব্যাংক পদ্ধতি) ধাতব বস্তু (স্বর্ন মুদ্রা)স্বর্ণ মুদ্রা) নিজের কাছে রেখে দিয়ে একটি কাগজের নোট দিতো যেটা  ছিল মূলত একটি টোকেন । এই টোকেন টি ব্যাংকে রিজার্ভ রাখা মুদ্রা কে represent করতো, এবং মানুষ বিশ্বাস করতো কাগজের এই মুদ্রার ভ্যালু আছে যা দ্বারা তারা ক্রয় করতে পারবে যেকোনো পণ্য,   অথবা এই কাগজের নোট নিয়ে ব্যাংকে যে যাবে তাকেই সেই ধাতব মুদ্রা ফেরত দেওয়া হবে।  

ব্যাংক সিস্টেম তৈরী হয়েছে মূলত এই ধারণার উপর ভিত্তি করে ।  ব্যাংক যে পরিমান স্বর্ন নিজের কাছে আমানত রাখে তার সমমূল্যের  ডলার ছাপাতে পারবে এর বেশি ডলার ছাপাতে পারবে না । স্বর্ণ নির্দিষ্ট তাই সেই হিসাবে ইচ্ছামত ডলার বা মানি কোনো দেশ ছাপাতে পারবে না।  এই সিস্টেমকে বলা হয় গোল্ড স্ট্যান্ডার যার অর্থ হলো আমার স্বর্ণ ব্যাংকে আছে তার বিনিময় ব্যাংক আমাকে একটা কাগজের নোট বা সার্টিফিকেট দেয়।  এপর্যন্ত কোনো সমস্যা ছিল না । কিন্তু সমস্যা শুরু হলো এরপর থেকে ।  ১৯৩১ সালে ব্রিটেন গোল্ড স্টান্ডার থেকে সরে এসেছে । এর 2 বছর পর ১৯৩৩ সালে আমেরিকা চরম অর্থনীতি মন্দার কারণে  গোল্ড স্টান্ডার থেকে ফেরত আসে । সুতরাং এখন ব্যাংকে কি পরিমাণ স্বর্ণ আছে সেটা জানার প্রয়োজন নেই ব্যাংক ইচ্ছামতো ডলার ছাপাতে পারবে।  অবশ্যই ব্যাংক ইচ্ছামতো ডলার ছাপালে সেটার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে । যাকে মুদ্রাস্ফীতি বলা হয় । ধরুন আপনার কাছে ১ লাখ ডলার আছে । ১ বছর পরে সেই ১ লাখ ডলার এর মূল্য ৯৫ হাজার ডলার এর সমান হয়ে যাবে । আজকে  আপনি ১ লাখ ডলার দিয়ে যা কিনতে পারবেন ১ বছর পরে ১ লক্ষ ৫ হাজার ডলার লাগবে ওই জিনিস কিনতে।  আর এটাই মুদ্রাস্ফীতি। 

বিটকয়েন কি বিটকয়েন দিয়ে আয়

ব্যাংকিং সিস্টেমের আরো একটি সীমাবদ্ধতা হলো যখন আপনি ইউরোপ থেকে আমেরিকা আসবেন তখন আপনার ইউরো আমেরিকায় চলবে না । এবং তখন আপনাকে ইউরো কনভার্ট করে ডলার এ পরিণত করতে হবে । যার জন্য আপনাকে আলাদা ঝামেলা পোহাতে হবে । এক্ষেত্রে একদেশ থেকে অন্য দেশে money transfer এর সময় ব্যাংক মধ্যস্থতা করে । এবং কোনো কারণে এই money transfer প্রক্রিয়া টি ব্যাংক চাইলে বন্ধ করে দিতে পারে । 

১৯৯৯ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করা হয় কিন্তু সেখানেও দেশের গভর্মেন্ট আপনার লেনদেনের মাঝে কেন্দ্রীয় ভুমিকা পালন করে ।  

বিটকয়েনের ইতিহাস

মূলত ডলার বা প্রচলিত অর্থের সীমাবদ্ধতার জন্য 31 October 2008 তারিখে Satoshi Nakamoto নামে একজন অথবা একাধিক কোনো ব্যাক্তি নেমচিপ থেকে ডোমেইন ক্রয় করে। January 2009 সালে Satoshi Nakamoto নামে কোনো এক বা একাধিক লোক A Peer-to-Peer Electronic Cash System নামে একটি পেপার পাবলিশ  করেন ,  এই পেপারে উনি ব্লকচেইন কি এবং কিভাবে কাজ করে এগুলো বলেছেন । A Peer-to-Peer Electronic Cash System পেপারে উনি বলেছেন কিভাবে কোনো সেন্টার  বা ব্যাংক  ছাড়া বিটকয়েন দিয়ে  লেনদেন করা যায়। 

বিটকয়েন কি বিটকয়েন দিয়ে আয়

 January 12, 2009 সালে  Satoshi Nakamoto প্রোগ্রামার  halfin কে ১০টি বিটকয়েন প্রদান করে  . halfin  তার টুইটারে টুইট করেছেন  Running  bitcoin. তারপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন  মানুষ বিটকয়েনের প্রচার করা শুরু করেছে ।   ২০০৯ সালে অক্টোবর মাসে ১৩০৯টি বিটকয়েনের দাম ছিল ১ ডলার।  2009 সালে বিটকয়েন তৈরী হবার পর বিটকয়েন দিয়ে সর্বপ্রথম ট্রান্সজেকশান করা হয়  । যেখানে ১০০০০ বিটকয়েন দিয়ে ২ টি পিজ্জা ক্রয় করা হয় ।  কিন্তু বর্তমান ১টি বিটকয়েন দিয়ে পিজ্জার ফ্যাক্টরি দেওয়া যাবে । ২০১৭  সালে ১ জানুয়ারিতে একটি বিটকয়েনের দাম ছিল ৯০০ ডলার ঠিক ডিসেম্বরে মাসে বিটকয়েনের দাম উঠে দাঁড়ায় ১৯৫০০ ডলার।  তারপর দুই বছর পর ২০১৯ সালে বিটকয়েনের দাম কমে যায় ।  তখন বিটকয়েনের দাম হয় ৩ হাজার ডলার  . তারপর ধীরে ধীরে বিটকয়েনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো , বিভিন্ন দেশ বিটকয়েনকে বৈধতা দিলো।   তারপর থেকে বিটকয়েনের দাম বৃদ্ধি পায় এবং এরপরে বিটকয়েনের দাম আর কখনো কমে নাই  । বর্তমান ১ বিটকয়েনের দাম ৪০ হাজার ডলার 

বিটকয়েনের সুবিধা 

১. বিটকয়েন যেহেতু পিয়ার টু পিয়ার সিস্টেম তাই যেকোনো মুহূর্তে বিটকয়েন যেকোনো দেশে ট্রান্সফার করা যায়  কোনো ধরণের ব্যাংক ছাড়া । 

২. অন্যসব মুদ্রা যেমন ডলার to  ইউরো কনভার্ট করা ঝামেলা বিটকয়েনে সেই ঝামেলা নাই।  

৩. বিটকয়েনের সাপ্লাই নির্দিষ্ঠ যার সংখ্যা হলো ২১million , বিটকয়েন কখনো এর থেকে বেশি তৈরী করা সম্ভব নয়। 

৪. বিটকয়েনের সাপ্লাই যেহেতু নির্দিষ্ঠ আবার স্বর্ণের সাপ্লাই নির্দিষ্ঠ তাই বিটকয়েন আর স্বর্ণের ভিতরে কোনো অমিল নেই । বিটকয়েন কে ডিজিটাল গোল্ড বলা যেতে পারে। 

৫. বিটকয়েন যেহেতু দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে তাই আপনি একটি বিটকয়েন কিনে রাখলে ১ বছর পরে দ্বিগুন মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

৬. মাটি থেকে যেভাবে স্বর্ণ উত্তোলন করা যায় ঠিক সেভাবে বিটকয়েন মাইনিং করে বিটকয়েন সংগ্রহ  করতে পারবেন।  

৭. ব্লকচেইন টেকনোলজি দ্বারা যেহেতু বিটকয়েন প্রতিষ্ঠিত তাই বিটকয়েন হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনা নেই।  

৮. বিটকয়েন ইচ্ছামতো ছাপানো বা বানানো সম্ভব নয় তাই বিটকয়েনের ক্ষেত্রে মুদ্রা স্ফীতির ভয় নেই। অপরদিকে আগে আপনি ১০০ ডলার দিয়ে যা করতে পারতেন এক বছর পর কি ১০০ দলের দিয়ে সেটা করতে পারবেন ? অর্থাৎ ডলারের দাম প্রতিনিয়ত কমছে।  

বিটকয়েনের অসুবিধা 

১. বিটকয়েন যেহেতু পিয়ার to  পিয়ার ট্রান্সজেকশন হয় তাই একবার মানি ট্রান্সফার  করলে সেটা আর ফেরত আনা যায় না যদি না যাকে পাঠানো হয়েছে সে চায় ।   

২. বিটকয়েন যেহেতু কোনো কেন্দ্র বা ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় তাই অপরাধীরা খুব সহজে নিজের পরিচয় গোপন রেখে ট্রান্সজেকশন করতে পারে।  

কিভাবে বিটকয়েন থেকে আয়  করা যায় 

বিটকয়েন কি বিটকয়েন দিয়ে আয়

১. বিটকয়েন থেকে আয় করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো মাইনিং করা ।  যখন  বিটকয়েন দিয়ে কেউ ট্রান্সজেশন করবে তখন ট্রান্সজেকশন সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা সেটা যাচাই করা হয় বিটকয়েন মাইনারদের মাধ্যমে ।  যে মাইনিং করে সে কিছু ধাঁধা সমাধান করে।  এইভাবে মাইনাররা ট্রান্সজেকশন  সঠিক নাকি ভুল যাচাই করে তখন পুরস্কার হিসাবে কিছু বিটকয়েন মাইনারদের দেওয়া হয়।  2009 সালে Satoshi Nakamoto নামের ব্যাক্তি প্রথম মাইনিং  করেন তখন বাসা বাড়িতে নরমাল কম্পিউটার দিয়ে মাইনিং করা গিয়েছিল।  কিন্তু বর্তমান মাইনিং করতে প্রয়োজন গ্রাফিক্স কার্ড।  

২. কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মাইনিং যন্ত্র দিয়ে মাইনিং করে বিদ্যুৎ বিল খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব। তাই ভালো উপায় হলো বিটকয়েন ক্রয় করে রাখা এবং যখন দাম বৃদ্ধি পাবে তখন বিটকয়েন বিক্রি করে দেওয়া ।  যেহেতু বিটকয়েনের দাম কমে বাড়ে যখন কমবে তখন কিনবেন তারপর বিটকয়েনের দাম বাড়লে আপনি আপনার বিটকয়েন বিক্রি করে দিবেন।  বর্তমান ১ বিটকয়েনের দাম ৪০ হাজার ডলার । অনেকের পক্ষেই হয়ত এতো দামে  বিটকয়েন কেনা অসম্ভব  । তাই আপনি বিটকয়েনের ক্ষুদ্রতম অংশ সাতোশি কিনে রাখতে পারবেন।  

৩. এছাড়া আপনি ট্রেডিং করতে পারেন।  মার্কেট যখন ডাউন থাকবে তখন আপনি বিটকয়েনে ট্রেড করবেন যখন ভালো একটা প্রোফিট পাবেন তখন ট্রেড ক্লোজ করে দিবেন। 

৪.  এছাড়া অনলাইন বা অফলাইনে বিজনেস এর বিনিময় মাধ্যম হিসেবে  বিটকয়েন ব্যবহার করা যেতে পারে। আপনার কাস্টমারকে বলবেন তারা যেনো বিটকয়েন দিয়ে পেমেন্ট করে। 

উৎস :

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।